আজও উত্তমকুমার সর্বত্র আছেন: সৃজিত মুখার্জি

    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৪ মিনিট

বাংলা সিনেমার 'মহানায়ক' হিসেবে পরিচিত উত্তমকুমারের জন্মশতবর্ষে তাকে নিয়ে বিবিসি বাংলা যখন দু'চার লাইন লেখার অনুরোধ জানায় সৃজিত মুখার্জিকে, তিনি তখন তার নতুন ছবির প্রচার নিয়ে মহাব্যস্ত।

কিন্তু পরিচালকের চেনা-অচেনা সবাই জানেন, উত্তমকুমার তার কত বড় দুর্বলতার জায়গা।

বছর দুয়েক আগে যখন 'অতি উত্তম' ছবিটা তিনি বানান, বলা যেতে পারে সেটা ছিল উত্তম কুমারের প্রতি তার একজন 'চিরন্তন ফ্যানবয়ের' শ্রদ্ধাঞ্জলি।

সৃজিতের কাছে উত্তমকুমার ফেলে আসা দিনের মহাতারকাই শুধু নন, তিনি যে আজ এই পেশায় আছেন তার পেছনেও তার ভূমিকা বিরাট।

উত্তমকুমার তাকে সিনেমার জগতে আসতে নীরবে অনুপ্রাণিত করেছেন- যে কথা সৃজিত অতীতেও বহুবার বহু জায়গায় বলেছেন।

শেষ পর্যন্ত উত্তমকুমারকে নিয়ে নানা বিষয়ে তিনি বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন।

বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তমকুমারের লিগ্যাসি

বাংলা সিনেমায় উত্তমকুমারের লিগ্যাসি আপনার কাছে কী?

সৃজিত মুখার্জি বলছিলেন, "লিগ্যাসি কথাটা আসলে বেশ গোলমেলে, এটা বলতে কে কী বোঝান সেটা ব্যাখ্যা করাটা বেশ মুশকিল। তবে বাংলা সিনেমায় উত্তমকুমারের লিগ্যাসি ঠিক কী, সেটা নিয়ে কিন্তু বিশেষ ধন্দ নেই!"

তার মতে, এক কথায় বলতে গেলে বাংলার ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে উত্তমকুমারের লিগ্যাসি আসলে সর্বব্যাপী এবং সর্বত্র বিরাজমান।

"আজও আমাদের ফিল্মের দুনিয়ায় কলাকুশলীদের রোজকার লড়াইয়ে তিনি আছেন। বাংলা সিনেমার বড় বড় মেগাতারকাদের স্টারডমেও আছেন প্রবলভাবে। বাংলা সিনেমার সাধারণ দর্শকরা যেভাবে তাদের ম্যাটিনি আইডলদের ভালোবাসেন ও পুজো করেন, তাতেও তিনি আছেন প্রবলভাবে"।

"মানে উত্তমকুমার যেন সব কিছুর একটা টেমপ্লেট তৈরি করে দিয়ে গেছেন, বেঞ্চমার্কটাকে খুব উঁচু তারে বেঁধে দিয়ে গেছেন; আজকের বাংলা সিনেমা জগতও সেই কাঠামোর মধ্যেই বাঁচতে শিখেছে, সিনেমাকে ভালোবাসতে শিখেছে এবং ওই যেটা বললাম, আজও উত্তমকুমার সর্বত্র আছেন," বলেন সৃজিত।

তার কথায়, "বাংলায় সিনেমার প্রতি আজও যে অপরিসীম ভালোবাসা আমরা দেখতে পাই, উত্তমকুমার ও তার লিগ্যাসি হলো সেটার প্রাণভোমরা!"

"আর সেই লিগ্যাসির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তার অন্তর্নিহিত বাঙালিয়ানা – যেটা সব ছবিতে না হলেও আজকের বাংলায় নির্মিত বহু ছবিতেই ধরা পড়ে। বাঙালিয়ানার সংজ্ঞা হয়তো বদলায়, পদ্ধতি-প্রকরণও অল্পস্বল্প পাল্টায় কালের নিয়মে – কিন্তু সম্পূর্ণ বাঙালিয়ানা বিবর্জিত ক'টা ছবিই বা আজও বাংলায় হয়, ভাবুন তো!

আমি বিশ্বাস করি সেই সব ছবিতে এই যে বাঙালিয়ানা, বা যেটাকে 'সিনেমাটিক বাঙালিয়ানা'-ও বলা যেতে পারে – এই যেটা আমরা দেখতে পাই – তার জন্য আমরা কিন্তু সবচেয়ে বেশি উত্তমকুমারের লিগ্যাসির কাছেই ঋণী!"

উত্তম বনাম সৌমিত্র

উত্তম বনাম সৌমিত্র তুলনাটা কীভাবে দেখেন?

"গত পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাঙালির প্রিয় তর্কগুলোর একটা হলো উত্তম কুমার ভার্সেস সৌমিত্র চ্যাটার্জি! মোহনবাগান বনাম ইস্টবেঙ্গল, ঘটি বনাম বাঙাল বা এককালের কংগ্রেস বনাম সিপিআইএমের চেয়ে কোনো অংশে কম ফাটাফাটি নয় এই তর্কাতর্কি। কিন্তু এখানে আমার যেটা 'টেক' তার সঙ্গে অনেকেই হয়তো একমত হবেন না," বলেন সৃজিত মুখার্জি।

তবে তার মতে, উত্তমকুমারের সঙ্গে সৌমিত্রর কোনো তুলনাই হতে পারে না।

"এটা অবশ্যই মানি, সৌমিত্র চ্যাটার্জি অবশ্যই একজন খুব, খুব প্রতিভাবান ও গিফ্টেড অভিনেতা। বহু ছবিতে তার অভিনয় আমারও চোখে লেগে আছে। কিন্তু অসাধারণ অভিনয় দক্ষতার সঙ্গে অতিমানবিক স্টারডম যেখানে মিলেমিশে একাকার, সেই জিনিস কিন্তু আমরা উত্তমকুমারের মধ্যেই দেখেছি।"

এমন বিরল দুটো গুণের সংমিশ্রণ উত্তমকুমার ছাড়া বাংলার আর কোনো অভিনেতার মধ্যে কখনো কোনোদিন আসেনি বলে মনে করেন সৃজিত।

ফলে উত্তমকুমারকে কারো সঙ্গে তুলনাই করতে হয়, তাহলে সেটা কমল হাসান বা অমিতাভ বচ্চনের মতো মেগাতারকার সঙ্গে করতে চান তিনি।

উত্তম-সুচিত্রা কেমিস্ট্রির রহস্যটা কী?

বাঙালি 'উত্তম' শব্দটা বললেই তার সঙ্গে আর যে শব্দটা চলে আসে তা 'সুচিত্রা'।

তাদের জুটির রসায়ন নিয়ে সৃজিত মুখার্জি বলেন, "এটা ঠিকই যে উত্তমকুমার আর সুচিত্রা সেনের রসায়ন আমাদের মতো বাংলা সিনেমার দর্শকদের কিছু অবিস্মরণীয় মুহূর্ত উপহার দিয়েছে। বিশেষ করে 'চাওয়া-পাওয়া' বা 'ইন্দ্রাণী'র মতো ছবিতে এরকম বহু দৃষ্টান্ত আছে। এই মোমেন্টসগুলো সত্যিই আসাধারণ, বাংলা সিনেমার সম্পদ।"

তবে এর বাইরেও তিনি উত্তমকুমারের সঙ্গে আরও দুটি জুটির কথা উল্লেখ করেন যা তাকে মুগ্ধ করেছে। এই দুটো জুটি হলো উত্তমকুমার-অঞ্জনা ভৌমিক, আর উত্তমকুমার-সুপ্রিয়া দেবী।

"অঞ্জনা ভৌমিকের বিপরীতে বেশ কয়েকটি অসাধারণ ছবি করেছিলেন উত্তমকুমার। 'নায়িকা সংবাদ', 'চৌরঙ্গী', 'থানা থেকে আসছি', 'রাজদ্রোহী', 'রৌদ্রছায়া' – কোনটা ছেড়ে কোনটার কথা বলব?"

"আর অনেক দিনের জীবনসঙ্গিনী সুপ্রিয়া দেবীর সঙ্গেও অল্প কিছু ছবি করেছেন, সেগুলোও আমার ভীষণ প্রিয়! এর মধ্যে আছে 'কাল তুমি আলেয়া', 'মেঘ কালচে' বা 'কোথায় পাব তারে'-র মতো বেশ কয়েকটা ছবি।

তবে এই জুটির তিনটে সবচেয়ে ফেভারিট ছবির নাম বলতে বললে আমি বলব 'সন্ন্যাসী রাজা', 'মন নিয়ে' আর 'সবরমতী'। উত্তম-সুপ্রিয়া জুটিকে সবচেয়ে ভালো ডিফাইন করে এই তিনটে ছবিই।"

সুতরাং উত্তমকুমারের মহানায়কোচিত রোমন্টিকতা শুধু সুচিত্রা সেনের সঙ্গে জুটিতেই শেষ নয়, সেটার আরো অনেকগুলো সূক্ষ পরত আছে-এমনটাই ভাবনা এই উত্তমভক্তের।