সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের সুরক্ষার ব্যবস্থা কতটা আছে

ছবির উৎস, FAYEZ NURELDINE/AFP via Getty Images
- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
সৌদি আরবে এক নারীসহ দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবরে সারাদেশে যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে তার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশটিতে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের সুরক্ষা কতটা আছে সেই প্রশ্নটি।
বাংলাদেশ থেকে গত দুই বছর যত নারী কর্মী বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গিয়েছেন তার বেশিরভাগই গিয়েছেন সৌদি আরবে। এরপরেই আছে জর্ডানের অবস্থান। তবে সৌদি আরবের তুলনায় জর্ডানে যাওয়া নারীর সংখ্যা এক তৃতীয়াংশেরও কম।
সরকারি হিসেবে, ২০২৪-এর জানুয়ারি থেকে শুরু করে চলতি বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত এক লাখ ৭২ হাজারের বেশি নারী শ্রমিক বিদেশে গেছেন। এর মধ্যে সৌদি আরবেই গেছেন প্রায় এক লাখ ২০ হাজার।
আবার দেখা যাচ্ছে, চলতি বছরে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্য দেড় হাজারের বেশি নারী কর্মী দেশে ফিরে এসেছেন, যার মধ্যে সৌদি আরব থেকেই ফিরেছেন প্রায় এক হাজার।
ফিরে আসা নারী কর্মীদের নিয়ে কাজ করেন এমন সংস্থাগুলো বলছে, মূলত শারীরিক-মানসিক নিপীড়ন, ঠিকমতো বেতন না পাওয়া কিংবা একেবারেই না পাওয়া এবং যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়াটাই অধিকাংশ নারী শ্রমিকের ফিরে আসার মূল কারণ।
এমনই একটি সংস্থা অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম ওকাপের চেয়ারপার্সন শাকিরুল ইসলাম বলছেন, সারাদেশের কত নারী বিদেশ থেকে প্রতি বছর ফিরে আসতে বাধ্য হন তার পূর্ণাঙ্গ তথ্যও পাওয়া যায় না।
"যারা ফিরে এসেছেন তাদের নিয়ে গত বছর জুলাইয়ে করা গবেষণায় আমরা দেখেছি যে ৯০ ভাগই ফিরে এসেছেন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
সৌদি আরবের বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলছেন, এক দশক আগে গৃহকর্মী নিয়ে সৌদি আরব ও বাংলাদেশ যে চুক্তি করেছিল তাতে কর্মীদের সুরক্ষার বিষয়টি যথাযথভাবে আসেনি।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা শুধু বলছেন, সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তারা নিয়মিতভাবেই এ বিষয়ে সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছেন।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ছবির উৎস, FAYEZ NURELDINE/AFP via Getty Images
কোনো সুরক্ষার ব্যবস্থা আসলে আছে?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
ভিশন ২০৩০ এর আওতায় সৌদি কর্তৃপক্ষ শ্রম আইনে কয়েক বছর আগে থেকে কিছু সংস্কার এনেছে কর্মীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য। তখন দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এর ফলে বিদেশি কর্মীদের চাকরি পরিবর্তন ও চলাচলের স্বাধীনতা বাড়বে।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সৌদি প্রেস এজেন্সি বলেছিল, সৌদি আরব গৃহকর্মী ও সমপর্যায়ের কর্মীদের নিয়োগসংক্রান্ত বিধিমালা সংশোধন করেছে।
এতে বলা হয়, নিয়োগকর্তারা কর্মীদের চাকরির চুক্তিতে উল্লেখ নেই - এমন কোনো কাজ করতে বাধ্য করতে পারবেন না।
একইভাবে, তাদের তৃতীয় কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করতে বাধ্য করা কিংবা এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করাও নিষিদ্ধ, যা তাদের স্বাস্থ্য, শারীরিক নিরাপত্তা বা মর্যাদার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
কিন্তু এরপরেও দেশটিতে বাংলাদেশি নারীকর্মীদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ থামেনি।
সৌদি আরবে নারী শ্রমিক কখন থেকে যাওয়া শুরু হয় তার আনুষ্ঠানিক তথ্য খুব একটা পাওয়া যায় না। তবে গৃহকর্মী হিসেবে আরও কয়েকটি দেশের সঙ্গে বিপুল সংখ্যায় বাংলাদেশি নারীরা সেখানে কাজ করছেন প্রায় দুই বা আড়াই দশক ধরে; কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সির সঙ্গে আলাপ করে এই ধারণা পাওয়া গেছে।
২০২৫ সালের ৬ই অক্টোবর সৌদি আরবের তখনকার মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়নমন্ত্রী আহমেদ আল-রাজহি এবং বাংলাদেশের তৎকালিন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল একটি সাধারণ শ্রমিক নিয়োগ চুক্তিতে সই করেছিলেন।
তখন সৌদি প্রেস এজেন্সির খবরে বলা হয়েছিল, ওই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়ার জন্য একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হবে। এর আওতায় কর্মী ও নিয়োগকর্তা—উভয়ের অধিকার সুরক্ষা এবং তাদের মধ্যকার চুক্তিভিত্তিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
সে সময় সরকারি সংস্থা বাসস বলেছিল, ১৯৭৬ সালে প্রথম বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে শ্রমিক পাঠানো শুরু হয়। তখন থেকে প্রায় ৩০ লাখের বেশি বাংলাদেশি শ্রমিক সৌদি আরবে কাজ করছেন, যা বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে ভূমিকা রাখছে।
কিন্তু গত দশকের শুরু থেকে বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিক নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসার ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার প্রেক্ষাপটে ২০১৫ সালে দুই দেশ গৃহকর্মী নেওয়ার বিষয়ে চুক্তিটি করেছিল।
দুই বছরের চুক্তিতে যাওয়া নারী গৃহকর্মীরা মাসে সৌদি মুদ্রায় ৮০০ রিয়াল বেতন পাওয়ার কথা এবং চুক্তিতে বলা হয়েছিল গৃহকর্মীরা বিনা খরচে সৌদি আরবে যেতে পারবেন।
কিন্তু ফিরে আসা কর্মীদের উদ্ধৃত করে বেসরকারি সংস্থাগুলো বলছে, অনেক নারী কর্মী বেতন থেকেই বঞ্চিত হয়েছেন এবং বেতন দাবি করায় এক পর্যায়ে তাদের নির্যাতন করে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

ছবির উৎস, AMER HILABI/AFP via Getty Images
নিপীড়ন কমছে না কেন
সৌদি আরবে বাংলাদেশি নারী কর্মীদের নিপীড়নের প্রবণতা কমানো যাচ্ছে না কেন এমন প্রশ্নের জবাবে রিয়াদ ও জেদ্দায় বাংলাদেশ দূতাবাসের সূত্রগুলো বলছে, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ বা দক্ষতা নেই এমন নারীদের বেশি পাঠানোর কারণেই সংকট বেড়েছে।
সৌদি আরবে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসিহ বলছেন, গৃহকর্মী চুক্তিটাতেই কর্মীদের সুবিধা ও সুরক্ষার বিষয়টি যথাযথভাবে আসেনি।
"অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই ওই চুক্তিতে তখন রাখা হয়নি। আবার এজেন্টরা অজপাড়াগাঁও থেকে মেয়েদের এনে কোনো প্রশিক্ষণ ছাড়াই সৌদিতে পাঠানো শুরু করলো। ফলে সংকট আরও জটিল হলো। গ্রামের সহজ সরল মেয়েদের অনেকে সেখানে গিয়ে বিপদের মুখে পড়লো। আমরা সেফ হোম করেছিলাম। সেখানে এক সময় বহু বাংলাদেশি নারী আসা শুরু করলো," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
জানা গেছে, নির্যাতনের শিকার হওয়ার কারণে ইন্দোনেশিয়া ২০১১ সালের অগাস্টে নারী শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করে দিলে সৌদি আরব ফিলিপিন্স, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের ওপর চাপ বাড়ায়।
নেপাল ও শ্রীলঙ্কা মাসিক সতেরশ রিয়ালের নিচে শ্রমিক পাঠাতে রাজি হয়নি। অন্যদিকে ফিলিপিন্স তাদের নারী কর্মীদের নিয়োগকর্তার বাসার বদলের সৌদি প্রতিষ্ঠানের ডরমিটরিতে রাখার বিষয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তি করে।
এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের চাপে বাংলাদেশ সাড়ে আটশ রিয়ালেই গৃহকর্মী নিয়োগের চুক্তি করতে রাজি হয়।
পরে বাংলাদেশ নারী কর্মীদের নিপীড়নের বিষয়টি সামনে আনলে ২০১৯ সালের অগাস্টে তখনকার সৌদি শ্রম ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধিদের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তাদের ক্ষোভের মূল কারণ ছিল, বাংলাদেশি কর্মীরা কেন সৌদি নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন এবং কেন তারা দ্রুতই দেশে ফিরতে চান।
ওই সময় সৌদি আরবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন গোলাম মসিহ।
বিবিসি বাংলাকে তিনি বলছেন, "প্রশিক্ষণ ও ভাষাগত দক্ষতা না থাকার কারণেই সমস্যা হচ্ছিল। তখন সৌদি কর্তৃপক্ষ সেটাই বলছিলেন। গৃহকর্মী পাঠানোর আগে সুযোগ-সুবিধা সম্পর্কে জানানো ও সেখানকার বাসাগুলোর আধুনিক উপকরণ ব্যবহারে দক্ষ করার কথা বলেছিলাম আমরা। কিন্তু এজেন্সিগুলোর কারণে সেটি গুরুত্ব পায়নি"।
মি. মসিহ বলছেন, "ফিলিপিন্স থেকে যাওয়া কর্মীরা ডরমিটরিতে থেকে যেভাবে কাজ করে সেটি বাংলাদেশিদের জন্য করার চেষ্টা আমরা করেছিলাম। কিন্তু নানা কারণে তা হয়নি"।

ছবির উৎস, Amnesty International
'আমরা আর মানুষ থাকি না'
চলতি বছরের গত ৯ই জুলাই আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক রিপোর্টে ফিলিপিন্সের নারী কর্মীদের সৌদি আরবে বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঘটনা উঠে এসেছে।
এর মধ্যে রয়েছে অতিরিক্ত কাজ করানো, শোষণ, মর্যাদাহানিকর আচরণের শিকার হওয়া এবং কিছু ক্ষেত্রে যৌন নিপীড়ন।
"একবার যখন তাদের বাড়িতে ঢুকি তারপর আমরা আর মানুষ থাকি না"- এই শিরোনামে সংস্থাটি ভুক্তভোগী ১৯ জন নারীর অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়েছিল ওই রিপোর্টে। এদের অধিকাংশই ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে দেশে ফিরে গিয়েছেন।
এর আগে ১৯৯৮ সালে নেপাল সৌদি আরবে নারী কর্মী পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল। সে বছর কুয়েতে নির্যাতনের শিকার এক নেপালি গৃহকর্মী আত্মহত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এরপর কর্তৃপক্ষ নারীদের সৌদি আরব, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতারে যাওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পরে ২০২২ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে সৌদি আরবে নেপালি গৃহকর্মী পাঠানো নিয়ে সমঝোতা হয়নি।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে নেপাল ও সৌদি আরবের মধ্যে সাধারণ কর্মীদের অধিকার রক্ষায় একটি চুক্তি সই হলেও, নারী গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট সমঝোতা হয়নি।
তবে সৌদি আরবে বিপুল সংখ্যক নেপালি নারীকর্মী দেখা যায় কারণ ভিন্ন পথে নেপালি নারীদের গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরবে যাওয়া অব্যাহত আছে।
ওদিকে শ্রীলঙ্কার শ্রম মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে গত দোসরা সেপ্টেম্বর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শ্রীলঙ্কার গৃহকর্মীদের জন্য উচ্চ বেতন, উন্নত জীবনযাত্রার মান এবং শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার সম্ভাবনা নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে দেশটির সরকার। সেখানে বলা হয়েছে, দেশটি নারীদের সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠাতে আগ্রহী নয়।
অ্যামনেস্টিকে সৌদি সরকারের বক্তব্য
বাংলাদেশিদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি সৌদি আরব।
তবে ফিলিপিন্সের নারীকর্মীদের নিয়ে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের যে রিপোর্ট করেছে তাতে সৌদি সরকারের একটি বক্তব্য এসেছে।
সেখানে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে সৌদি সরকার বলেছে, বিদ্যমান বিধিবিধানের আওতায় গৃহকর্মীরা সুরক্ষিত এবং নির্যাতনের যেকোনো অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তদন্ত করা হয়।
গৃহকর্মীদের সুরক্ষা জোরদার ও বিধিবিধানের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের কথাও তুলে ধরেছে দেশটির সরকার। এসব পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে মানসম্মত কর্মচুক্তি, মজুরি সুরক্ষা ব্যবস্থা ও বিমা কর্মসূচি, অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং নির্যাতন বা বিধিবিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তা পরিবর্তনের সুযোগ।
অ্যামনেস্টি অবশ্য বলেছে, এ বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত চেয়ে পাঠানো অনুরোধের জবাব দেয়নি সৌদি সরকার। গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় নেওয়া সংস্কার ও অন্যান্য পদক্ষেপ বাস্তবায়ন এবং কার্যকর করার বিষয়ে বিস্তারিত প্রশ্নেরও উত্তর দেয়নি তারা।









