আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বারুইপুর, গাইঘাটা, সামশেরগঞ্জ: পশ্চিমবঙ্গের কথিত এনকাউন্টারগুলো যে প্রশ্ন উসকে দিচ্ছে
অভিযুক্তকে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয় মধ্যরাতে, সেখানে পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে আক্রমণের চেষ্টা করে অভিযুক্ত, তার পরেই পুলিশের সঙ্গে এনকাউন্টার ও অতঃপর মৃত্যু; জুলাই মাসের সাত ও আট তারিখের বারুইপুরে কথিত এনকাউন্টারের যে ঘটনা সামনে এসেছিল, এবার গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে তার যেন হুবহু পুনরাবৃত্তি।
উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী অঞ্চল গাইঘাটায় ১৭ বছর বয়সী এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের অভিযোগে তারই এক আত্মীয়কে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। মঙ্গলবার সকাল হতেই জানা যায় যে পুলিশি হেফাজতে থাকার সময়ই মৃত্যু হয়েছে অভিযুক্তের।
মঙ্গলবার ভোর-রাতে একটি কথিত এনকাউন্টারের ঘটনার যে বিবরণ পুলিশের কাছ থেকে এসেছে, তার সঙ্গে জুলাই মাসে বারুইপুরে ঘটা 'এনকাউন্টারের' ঘটনার শুধু যে মিল রয়েছে সেটাই নয়, বরং উত্তর প্রদেশ রাজ্যে বহু 'এনকাউন্টারের' সময়ে এই বর্ণনাই সামনে আসে পুলিশ ও প্রশাসনের তরফ থেকে।
ঘটনাগুলো কীভাবে একই ভাবে ঘটছে- সেই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
আবার, উত্তর ২৪ পরগনায় এই কথিত এনকাউন্টারের ঘটনায় প্রশ্ন তুলেছেন মৃতের ভাই। আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেন, "মেয়েটিই দাদার দোকানে এসে অনেকবার ঝামেলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছিল।"
তার ভাই যে পুলিশের 'বন্দুক কেড়ে' পালাতে পারে এই কথা বিশ্বাস করেন না বলে জানিয়েছেন তিনি।
অন্যদিকে মুর্শিদাবাদের সামশেরগঞ্জে বিজেপিকর্মী সুজিত মণ্ডল খুনের ঘটনায় একই একায়দায় একই ঘটনা ঘটতে দেখা যায় একই দিনে।
সামশেরগঞ্জেও ঘটনা পুনর্নির্মাণের সময়ে পুলিশ হেফাজতে থাকা মূল অভিযুক্ত কথিত এনকাউন্টারে খুন হয়েছেন বলে জানা যাচ্ছে।
কী অভিযোগ উঠেছিল গাইঘাটা ও সামশেরগঞ্জে?
রোববার ২৫শে অক্টোবর সকালে গাইঘাটার ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরীর রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের তরফে যে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে যে গত শনিবার ২৪শে অক্টোবর সেই কিশোরী তার বন্ধুদের সঙ্গে বাড়ির কাছে একটি অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছিল।
পরিবারের দাবি, রাত ১১টা নাগাদ একটি ফোন আসে তার কাছে এবং সেই কিশোরী জলসা ছেড়ে বেরিয়ে যায়। তারপর বেশি রাতে পরিবারের লোকজন তার খোঁজ শুরু করলেও ওই রাতে তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।
বিবস্ত্র ও রক্তাক্ত অবস্থায় কিশোরীটির দেহ মেলায় পরিবার ধর্ষণের পর হত্যার মামলা দায়ের করে। তদন্তে নেমে পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করে।
পুলিশের তরফ থেকে গ্রেফতার ব্যক্তির কথিত এনকাউন্টারটি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। তবে পুলিশের অভ্যন্তরীণ সূত্র সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছে, পুলিশকে আক্রমণ করার চেষ্টা করেছিল ওই অভিযুক্ত।
ভাষ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার ২৭শে অক্টোবর ভোররাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণের জন্য অভিযুক্তকে নিয়ে ঘটনাস্থলে যায় পুলিশ। পরে অভিযুক্ত পুলিশের রিভলভার ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে গুলিও চলায় সে এবং একজন পুলিশকর্মী জখম হন। পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়।
অন্যদিকে সামশেরগঞ্জে গত সেপ্টেম্বর মাসে বিজেপিকর্মী সুজিত মণ্ডল নিখোঁজ হয়েছিলেন। পরে জানা যায়, খুন হয়েছেন ওই বিজেপি কর্মী। ঘটনায় সেপ্টেম্বর মাসেই গ্রেফতার হয়েছিলেন তিন অভিযুক্ত।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আজ ২৭শে অক্টোবর সামশেরগঞ্জের ডাকবাংলা এলাকায় পুলিশ মূল অভিযুক্তকে নিয়ে গিয়ে ঘটনার পুনর্নির্মাণ করার চেষ্টা করে। তখন অভিযুক্ত পুলিশের হাত থেকে বন্দুক ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করে বলে অভিযোগ এবং তখন একটি কথিত এনকাউন্টারে তার মৃত্যু হয়।
এক্ষেত্রেও সিআইডি বা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি মেলেনি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন
উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারে আসার পরেই পুলিশ 'এনকাউন্টারের' ঘটনা যে প্রথম হচ্ছে এমনটা নয়। কিন্তু এসব ঘটনার পেছনে যে গল্পগুলো উঠে আসছে সেগুলো অনেকটা একই রকম।
আর, উত্তরপ্রদেশে ঘটা একাধিক কথিত এনকাউন্টারের বর্ণনার সঙ্গেও এগুলো হুবহু এক।
একাধিক 'এনকাউন্টার', ভাষ্য একই
অতীতে ভারতে বহু এমন 'এনকন্টারের' ঘটনা ঘটেছে, যেখানে পুলিশের দাবি ছিল পুলিশের অস্ত্র নিয়ে পালানোর সময়ে অভিযুক্তের দিকে গুলি চালায় পুলিশ এবং তার ফলে মৃত্যু হয় সেই অভিযুক্তের।
প্রথম এই ধরনের ঘটনা সামনে এসেছিল ২০১৯ সালে তেলেঙ্গানা রাজ্যের রাজধানী হায়দরাবাদে।
এক পশুচিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে অভিযুক্তকে প্রায় মধ্যরাতে ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময়ে পুলিশের অস্ত্র ছিনিয়ে পালানোর চেষ্টা করে অভিযুক্ত বলে অভিযোগ করেছিল তেলেঙ্গানা রাজ্যের পুলিশ। তখনই গুলি চালানো হয়।
ওই ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তখন এই বিচারবহির্ভূত হত্যার নিন্দা করে বিবৃতি দিয়ে বলেছিল যে, সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমেই অপরাধীর শাস্তি হওয়া কাম্য।
ভারতের সবর্ববৃহৎ রাজ্য উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের কার্যকালে ১৭ হাজার ৪৩টি কথিত এনকাউন্টারের ঘটনা ঘটেছে বলে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে উত্তর প্রদেশ পুলিশ।এসব ঘটনায় মারা গিয়েছেন ২৮৯ জন।
এর মধ্যে অনেকগুলোই ঘটনার পুনর্নির্মাণের সময়ে পুলিশের অস্ত্র কেড়ে নিয়ে পালানোর সময়ে ঘটেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গত বছর ২০২৫ সালের ১৮ই ডিসেম্বর একটি নির্বাচনী প্রচারসভা থেকে শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, "আমরা সরকারে এলে ধর্ষকদের কোর্টে পাঠাব না। সকালে জমা করব, বিকালে খরচ করব।"
বারুইপুর ও গাইঘাটার ঘটনায় অনেকেই মুখ্যমন্ত্রীর ডিসেম্বরের প্রচারসভা থেকে দেওয়া বক্তব্যের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন।
সমালোচনায় মানবাধিকার সংস্থা ও বিরোধীরা
মানবাধিকার সংগঠন এপিডিআরের সহ-সভাপতি রঞ্জিত শূর একটি বিবৃতি পাঠিয়ে বিবিসিকে এই বিষয়ে তার অবস্থানের কথা জানান।
তিনি লেখেন, "এনকাউন্টারের গল্প সাজানোর জন্যই কি রাত ১২টায় হাত খোলা রেখে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল? বন্দি পালানোর চেষ্টা করলে তার পায়ে বা কোমরের নিচে গুলি করার কথা, তাহলে হত্যা করার জন্য গুলি কেন করা হলো? পুলিশের রিভলবার কীভাবে ছিনতাই হলো? এত সোজা?"
"পুরো পরিস্থিতির প্রাথমিক পর্যালোচনায় আমরা মনে করি, পুলিশ এনকাউন্টারের গল্প সাজিয়েছে। আসলে এনকাউন্টারের নামে ভূয়ো সংঘর্ষে হত্যা করা হয়েছে - ঠিক যেভাবে বারুইপুরে করা হয়েছিল।"
একই সঙ্গে রাজ্যে ক্রমেই বেড়ে চলা বন্দিমৃত্যু ও হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করেছেন তিনি, "এটা খুবই উদ্বেগের বিষয়। বারুইপুরের পরে কান্দি, হালিশহর, বীজপুর, ক্যানিং, দুবরাজপুরে পুলিশ হেফাজতে বন্দিমৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। কোন ক্ষেত্রেই দোষীদের শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। বিচারবিভাগের ভূমিকাও হতাশাজনক।"
কথিত এই এনকাউন্টারের সমালোচনা করে মমতা তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি সৌগত রায় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলেন, "এটা বারুইপুরের পর দ্বিতীয় এমন ঘটনা যেখানে এনকাউন্টারে অভিযুক্তের মৃত্যু হয়েছে। এটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও সরকারের উচিত এই বিষয়ে তদন্ত করা ও স্পষ্টভাবে সত্যিটা জনসমক্ষে তুলে ধরা।"
'এনকাউন্টারের' প্রশংসায় শাসকদল
'এনকাউন্টারের' প্রশংসায় অবশ্য বিবৃতি দিয়েছেন শাসকদলের নেতা মন্ত্রীরা।
সকালে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মন্ত্রী অশোক কীর্তনীয়া বলেন, "এটা শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। যারাই নারী ও বাচ্চাদের সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটাবে, তাদের পরিণতি এমনই হবে যেমন এই ঘটনা ঘটেছে।"
পশ্চিমবঙ্গের আরেক মন্ত্রী দিলীপ ঘোষ বলেন, "আগেও এমন ঘটনা ঘটেছে, খুনি পালাচ্ছিল, এনকাউন্টার হয়েছে। বিচারের আওয়াতায় আনতে হবে, আইনের উপরে কেউ নয়। কিন্তু কেউ আইন অমান্য করলে তার সঙ্গে এমনই হবে। পুলিশের উপর মানুষের আস্থা হারিয়ে গেছে, সেই আস্থা ফেরাতে এমন কাজ পুলিশকে করতে হবে।"
বিজেপি নেতা রাহুল সিনহা বলেন, "মমতা ব্যানার্জী প্রকাশ্যে ধর্ষকদের সমর্থন করেছিলেন এবং সেই কারণেই ধর্ষণের ঘটনা এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে পশ্চিমবঙ্গকে ধর্ষকদের রাজ্য বলা হতো, কিন্তু আজ বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই ধরনের ঘটনা ব্যাপকভাবে কমে গেছে।
কথিত এনকাউন্টারটি নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে তিনি বলেন, "তবে যাই ঘটুক না কেন, আমরা তা নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং আমরা এর ব্যবস্থা নেব ও এর একটি সমাধানও খুঁজে বের করব। ভবিষ্যতে এমন একটি শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা উচিত যাতে কোনো মা বা বোনকে নির্যাতন করা না হয়।"