লগি-বৈঠা সহিংসতার ২০ বছর: আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আগে যা যা ঘটেছিল

    • Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৯ মিনিট

২০০৬ সাল, সেই বছরের ২৮শে অক্টোবর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পাল্টা-পাল্টি সমাবেশ ঘিরে রীতিমত রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল ঢাকার পল্টন ও বায়তুল মোকাররম এলাকা।

লাঠি-সোটা ও আগ্নেয়াস্ত্র হাতে সেখানে রক্তক্ষয়ী এক সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন দল দু'টির নেতাকর্মীরা।

সেদিন ঢাকার রাস্তায় যেভাবে প্রকাশ্যে পিটিয়ে মানুষ হত্যা করা হয়েছিল, সেটি দেখে অনেকেই 'স্তম্ভিত' হয়েছিলেন বলে তখনকার গণমাধ্যমের খবরে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঢাকায় সেদিনের সংঘর্ষে কমপক্ষে পাঁচজন প্রাণ হারান, যা দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। একপর্যায়ে ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে থাকে।

সেসময়ের পত্রপত্রিকার তথ্যমতে, কেবল ২৮শে অক্টোবরের সহিংসতাতেই সারা দেশে প্রায় এক ডজন মানুষ নিহত এবং শতাধিক আহত হন।

এমন পরিস্থিতিতে সাবেক প্রধান বিচারপতি কেএম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে অপারগতা প্রকাশ করলে রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এতে পরিস্থিতি আরও জটিল আকার ধারণ করে।

আড়াই মাসের মাথায় সারা দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। সেনা সমর্থিত ওই সরকার পরবর্তীতে 'ওয়ান-ইলেভেন সরকার' নামেও পরিচিতি পায়।

কিন্তু এসব ঘটনার সূত্রপাত হয়েছিল কোথা থেকে? আওয়ামী লীগ ও জামায়াতের মধ্যকার সংঘর্ষের প্রেক্ষাপটই-বা তৈরি হয়েছিল কীভাবে?

রাজনৈতিক অচলাবস্থা

ওই সময় বিএনপির নেতৃত্বে চারদলীয় জোট সরকারের শেষদিকে বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। মূলত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ইস্যুতে তৎকালীন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেওয়ায় ওই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

"এই ইস্যুতে দলগুলোর মতবিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, কোনোপক্ষই ছাড় দিতে রাজি হচ্ছিল না," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।

নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর করার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে বিধান তখন ছিল, সংবিধান অনুযায়ী সেটার প্রধান হওয়ার কথা সবশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতির।

সেই অনুযায়ী, তখনকার সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারপ্রধান বানাতে চায় তৎকালীন জামায়াতের সাথে জোটবদ্ধ বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।

কিন্তু মি. হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানায় সেসময়ের বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা।

তারা অভিযোগ তোলে, একসময় বিএনপি'র রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত কেএম হাসানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করে আবারও ক্ষমতায় বসার 'ষড়যন্ত্র' করছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট।

এই পরিস্থিতির দুই বছর আগে, ২০০৪ সালের মে মাসে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনীর মাধ্যমে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়সসীমা ৬৫ থেকে বাড়িয়ে ৬৭ বছর করেছিল চারদলীয় সরকার।

মি. হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা বানানোর জন্যই ওই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগ করে বিরোধীরা।

কাজেই তাকে ওই পদে বসানো হলে লাগাতার হরতাল-অবরোধ কর্মসূচির মাধ্যমে দেশ অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারী দেয় আওয়ামী লীগ।

এর বিপরীতে বিএনপি-জামায়াতও পাল্টা কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থাকার ঘোষণা দেয়।

"পাল্টা-পাল্টি এমন অবস্থানের কারণে একপর্যায়ে তাদের মধ্যে সংঘাত অনিবার্য হয়ে পড়ে," বলেন লেখক ও বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ।

দফায় দফায় সংলাপ

সাবেক প্রধান বিচারপতি কেএম হাসান যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের দায়িত্ব নিতে না পারেন, সেজন্য বিএনপি জোট সরকারের শেষদিকে মিত্রদলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন শুরু করে আওয়ামী লীগ।

এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক যে অচলাবস্থা তৈরি হয়, সেটির সমাধানে দু'পক্ষকে সংলাপে বসার আহ্বান জানান জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিদেশি মিশনগুলোর রাষ্ট্রদূতেরা।

একপর্যায়ে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল বিএনপি ও বিরোধীদল আওয়ামী লীগ সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে আলোচনায় বসতে রাজি হয়।

ওই বছরের ২৮শে অক্টোবর ছিল চারদলীয় সরকারের শেষদিন।

ওই দিনের আগ পর্যন্ত বিএনপি'র তৎকালীন মহাসচিব আব্দুল মান্নান ভুঁইয়া ও আওয়ামী লীগের সেসময়ের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল অন্তত ছয় দফায় সংলাপে বসেন।

কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টাসহ নির্বাচনকেন্দ্রিক আরও বেশকিছু ইস্যুতে একমত হতে না পারায় সংকট থেকেই যায়।

খালেদা জিয়ার বিদায়ী ভাষণ

২৭শে অক্টোবর রাত ১২টার পর অষ্টম জাতীয় সংসদের বিলুপ্তি ঘটে। তার আগে, ওইদিন সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া।

সেখানে ক্ষমতায় থাকার পাঁচ বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে চারদলীয় জোট সরকারের সফলতা তুলে ধরে তাদেরকে আবারও ভোট দিয়ে নির্বাচিত করার আহ্বান জানান তিনি।

একইসঙ্গে, সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকট সমাধান না হওয়ায় দেশবাসীকে হতাশ না হওয়ার পরামর্শ দেন।

ভাষণে খালেদা জিয়া ঘোষণা করেন, সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না হওয়ায় সংবিধান অনুযায়ীই ব্যবস্থা গ্রহণ করে 'একটি সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন' করা হবে।

তার এমন বক্তব্যের পর অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দল।

পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি

সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার মাসখানেক আগেই একটি জনসভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলটির নেতাকর্মীদের উদ্দেশে ভাষণে নির্দেশনা দেন যে, তাদের দাবি আমলে না নিয়ে সাবেক প্রধানবিচারপতি কেএম হাসান যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেন, তাহলে সারা দেশ থেকে যেন তারা লগি-বৈঠা হাতে ঢাকার পথে রওনা হন।

তার সেই নির্দেশনা অনুযায়ীই ২৭শে অক্টোবর রাতে আনুষ্ঠানিকভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগের তখনকার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিল, যিনি ২০১৩ সালে মারা গেছেন।

দাবি আদায়ে তিনি ২৮শে অক্টোবর ঢাকার পল্টন ময়দানে সমাবেশ করারও ঘোষণা দেন। ফলে সেখানে যোগ দিতে রাতেই লগি-বৈঠা হাতে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন সারা দেশের তৃণমূল নেতাকর্মীরা।

দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত ১৪ দলের মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে অনির্দিষ্টকালব্যাপী অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার কথা ঘোষণা করেন আওয়ামী লীগ নেতা মি. জলিল।

অন্যদিকে, তাদের প্রতিহত করার জন্য পাল্টা কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপি ও তাদের জোটসঙ্গী জামায়াতে ইসলামী।

এর মধ্যে বিএনপি নয়াপল্টনে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে এবং জামায়াত বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে সমাবেশের ঘোষণা দেয়।

আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপি'র সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলও একইদিন পল্টন ময়দানে সমাবেশ করার ঘোষণা দিয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে নয়াপল্টনের সমাবেশে যোগ দেন।

তবে পাল্টা-পাল্টি কর্মসূচিতে সংঘাতের আশঙ্কায় পল্টন ও এর আশপাশের এলাকায় সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ।

শেষপর্যন্ত কোনো দলই পুলিশের নিষেধাজ্ঞা মানেনি।

আগের দিনেই হামলা শুরু

বিএনপি, আওয়ামী লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর পাল্টা-পাল্টা কর্মসূচিকে ঘিরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ফলে ২৭শে অক্টোবর থেকেই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সংঘর্ষের খবর আসতে থাকে।

চারদলীয় জোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার রাতেই তাদের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা শুরু হয়, যাতে অন্তত তিনজন নিহত হন।

এর মধ্যে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও গাজীপুরে বিরোধী দলের হামলায় বিএনপি ও জামায়াতের দু'জন স্থানীয় নেতা প্রাণ হারান।

অন্যদিকে, ঢাকার খিলগাঁও এলাকায় আওয়ামী লীগের মিছিলকে লক্ষ্য করে ছোড়া গুলিতে একজন পথচারী নিহত হন বলে পত্রিকার খবর থেকে জানা যায়।

মূলত সন্ধ্যায় খালেদা জিয়ার ভাষণের পর ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের গাড়ি, বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

এর মধ্যে ঢাকায় তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী নাজমুল হুদার বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও বিএনপি'র সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদের ডেমরা কার্যালয়ে আগুন দেওয়া হয়।

এছাড়া খুলনা, কুষ্টিয়াসহ আরও বেশকিছু জেলায় বিএনপি-জামায়াত নেতাকর্মীদের বাড়িঘরে হামলার খবর পাওয়া যায়।

সেইসঙ্গে, ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বেশকিছু দোকানপাট ও বিপনীবিতানে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

হামলার এসব ঘটনার সময় পুলিশ 'নিষ্ক্রিয় ভূমিকা' পালন করেছিল বলে ভুক্তভোগীদের অভিযোগ বিভিন্ন পত্রিকার খবরে উঠে আসে।

পল্টনের পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ

সমাবেশে অংশ নিতে ২৮শে অক্টোবর ভোরের মধ্যেই আওয়ামী লীগের তৃণমূলের অসংখ্য নেতাকর্মী লগি-বৈঠা হাতে ঢাকায় চলে আসেন।

সকালে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে দলে দলে নেতাকর্মীরা এসে তাদের সঙ্গে যুক্ত হন। সেখানে ১৪ দলীয় শরিক দলের নেতা কর্মীরাও ছিলেন। তবে তাদের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম।

এদিকে, পল্টন ময়দান তখন পুলিশের দখলে। সমাবেশের জন্য পল্টনে যে মঞ্চ দলটি তৈরি করেছিল, সেটিও ভেঙে দেওয়া হয়।

এমন পরিস্থিতিতে সকালের দিকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা গুলিস্তান ও বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের আশপাশে অবস্থান নিতে থাকেন।

একপর্যায়ে তারা গুলিস্তান থেকে পল্টন ময়দানের দিকে যাওয়ার পথটিতে একটি ট্রাকের ওপর অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করেন।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা ছিলেন বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর ফটকে। সঙ্গে ছিল দলটির ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতাকর্মীরা। তাদের হাতেও ছিল বাঁশ ও গজারি কাঠের তৈরি লাঠি-সোটা।

জামায়াত ও আওয়ামী লীগের কর্মীরা পরস্পরকে হটিয়ে পুরো এলাকা নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। দু'পক্ষই তখন বেশ মারমুখী অবস্থানে ছিল। ফলে যেকোনো সময় সংঘর্ষ শুরু হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল।

এমন পরিস্থিতিতে ওই এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি আরও বাড়ানো হয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তাদের বড় একটি দল পল্টনের মুখে তৈরি অস্থায়ী মঞ্চের দিকে এগিয়ে গিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সরিয়ে দেওয়া চেষ্টা করলে দু'পক্ষের মধ্যে শুরু হয় সংঘর্ষ।

সেসময় পুলিশ লাঠিপেটা করলে আওয়ামী লীগ কর্মীরা ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে পল্টন ময়দানের দখল নেওয়ার জন্য মাইকে ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগ নেতারা।

এরপর দলটির কর্মীরা একযোগে পুলিশের ব্যারিকেড ভেঙে পল্টনের দিকে এগোনোর চেষ্টা করলে সংঘর্ষ আরও তীব্রতর হয়।

সেসময় দফায় দফায় ককটেল বিস্ফোরণও হতে দেখা যায়। পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল যে, ককটেলগুলো আওয়ামী লীগ কর্মীরাই ফুটিয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাসের পাশাপাশি রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে পুলিশ।

সংঘর্ষটি প্রায় ঘণ্টা ধরে চলে, যেখানে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের কয়েক ডজন নেতাকর্মীদের আহত হন।

এ অবস্থায় সেদিন পল্টন ময়দানে সমাবেশ করতে না পারলেও মুক্তাঙ্গনের সামনে আরেকটি অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করে ভাষণ দিতে থাকেন আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের নেতারা।

জামায়াতের সঙ্গে সংঘর্ষ

পল্টনে সমাবেশ করতে না পেরে আওয়ামী লীগ কর্মীরা মুক্তাঙ্গন, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, গুলিস্তান মোড়সহ আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেন।

জামায়াতে ইসলামী তখন সমাবেশ করছিল বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর ফটকে। তবে তাদের নেতাকর্মীরাও পল্টন মোড়সহ আশপাশের সড়কে অবস্থান নিয়েছিলেন।

সকাল থেকে দু'পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লেও সেটি সংঘর্ষ রূপ নেয় দুপুরের দিকে। তখন ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া ও ইট-পাটকেল নিক্ষেপের পাশাপাশি মুহুর্মুহু গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।

এর মধ্যেই আওয়ামী লীগের সমাবেশ থেকে কিছু লোক এক ব্যক্তিকে ঘিরে ধরে রাস্তায় ফেলে বেধড়ক পেটাতে থাকেন। পরে ঘটনাস্থল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুরো ঘটনাটি তখন ধরে পড়েছিল সাংবাদিকদের ক্যামেরায়, যার কিছু পরদিনের পত্রিকায় ছাপা হয়। এছাড়া ঘটনাটির একটি ভিডিও পরবর্তীতে প্রকাশ হতে দেখা যায়।

প্রাথমিকভাবে পুলিশ নিহতের পরিচয় নিশ্চিত করতে না পারলেও পরবর্তীতে জামায়াত দাবি করে যে, ওই ব্যক্তি ছাত্র শিবিরের একজন নেতা ছিলেন। তার নাম মুজাহিদুল ইসলাম মুজাহিদ বলে জানানো হয়।

সংঘর্ষ চলাচলে বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে মুখে কাপড় বেধে প্রকাশ্যে আগ্নেয়াস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করতে দেখা যায়, যাতে বেশ অনেকে হতাহত হন।

ঢাকায় সেদিনের সহিংসতায় কমপক্ষে পাঁচজন নিহত ও দুই শতাধিক ব্যক্তি আহত হন।

নিহতদের মধ্যে চারজনকে নিজেদের নেতাকর্মী বলে দাবি করে জামায়াত। অন্যজন ওয়ার্কার্স পার্টির কর্মী বলে পরের দিনের পত্রিকার খবরে উল্লেখ করা হয়।

পল্টন ছাড়াও সেদিন শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, যাত্রাবাড়ীসহ ঢাকার আরও বেশকিছু এলাকায় আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

দিনভর চলা সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণে ঢাকায় সেদিন বিজিবি মোতায়েন করতে হয়েছিল।

কারা গুলি চালিয়েছিল?

জামায়াত ও আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ চলাকালে বেশ কয়েকজন ব্যক্তিকে প্রকাশে গুলি করতে দেখা যায়। সেসময়ের পত্রপত্রিকার খবর থেকে জানা যাচ্ছে যে, অস্ত্রধারীদের মধ্যে দু'দলের নেতাকর্মীরাই ছিলেন।

ঘটনার পরদিন প্রথম আলো পত্রিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিকেলে জামায়াতে ইসলামীর সমাবেশে দলটির তৎকালীন আমির মতিউর রহমান নিজামী ভাষণ দিতে মঞ্চে উঠলে আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী সমাবেশস্থল লক্ষ্য করে 'অন্তত ১২টি বোমা নিক্ষেপ করে'।

তখন সমাবেশস্থল ও আশপাশের কিছু ভবনের ছাদে থাকা জামায়াত-শিবিরকর্মীরা আওয়ামী লীগ কর্মীদের লক্ষ্য করে অর্ধশতাধিক রাউন্ড গুলি চালায়। গুলিগুলো রিভলভার, পিস্তল ও শটগান থেকে ছোড়া হয়েছিল এবং অস্ত্রধারীদের মুখ কাপড় দিয়ে বাঁধা ছিল বলে প্রথম আলোর রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।

এছাড়া জামায়াত-শিবিরের বহু নেতাকর্মীর হাতে সেদিন গজারি কাঠের লাঠি দেখা গিয়েছিল বলেও খবর বলা হয়েছে। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠায় একপর্যায়ে বক্তব্য শেষ না করেই মঞ্চ ত্যাগ করেন মি. নিজামী।

অন্যদিকে, ইংরেজি দৈনিক দ্য নিউ এজ পত্রিকায় অস্ত্রধারীদের বেশ কয়েক জনের ছবি ছাপা হয়। সেগুলোর একটির বর্ণনায় লেখা হয়েছে, আওয়ামী লীগের একজন কর্মী প্রতিপক্ষের দিকে গুলি নিক্ষেপ করছে।

আরেকটি ছবিতে বলা হয়েছে যে, শিবিরের একজন কর্মী প্রতিপক্ষের দিকে পিস্তল তাক করেছে।

দৈনিক সংগ্রাম ও নয়াদিগন্তের খবরে অস্ত্রধারীরা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী বলে দাবি করা হয়।

আর দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি ছবিতে একজনের মরদেহ রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখা যায়, খবরে যাকে শিবিরকর্মী বলে উল্লেখ করা হয়।

দিনভর সংঘর্ষ চলার পর সন্ধ্যায় পুলিশ ও বিজিবির সংখ্যা বাড়ানো হলে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়ে আসে। কিন্তু ততক্ষণে দেশের অন্যান্য জেলাতেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে, যা চলেছিল তিনদিন পর্যন্ত।

ওই তিনদিনের সহিংসতায় সারা দেশে প্রায় দুই ডজনের মতো মানুষ প্রাণ হারান, যাদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর বাইরে সাধারণ মানুষও ছিলেন বলে তখনকার গণমাধ্যমের খবর থেকে জানা যায়।